#একরাতেরগল্প
তখন ভোর ৪ টে, এমার্জেন্সীতে একটা পরিত্যক্ত বেডের উপর শুয়ে আছি। ঘুমটা তখন বেশ ভালোই হচ্ছিলো, গভীর ঘুমের মধ্যে মনেই ছিলো না যে বাড়ির বাইরে রয়েছি।
হঠাৎ Emergency বেলটা বেজে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সিস্টার সুপর্ণাদি দিয়ে এসে বললেন
" স্যার, পেশেন্ট এসছে, খারাপ পেশেন্ট......।
ব্যাস এটা শোনামাত্রই একটা অপ্রসন্ন মন আর চোখ ভর্তি ঘুম নিয়ে উঠে বসি। সত্যি বলতে কি ঘুমের মধ্যে থাকায় চশমাটা নেবার আর প্রয়োজন বোধ করি না। তবে ব্যাগ থেকে চিরুনি বার করে চুলটা দু একবার আঁচড়ে নিতে আমি ভুলি না। কারণ ঘাঁটা চুলে আমি লোকের সামনে যাই না।
যাইহোক, এরপর ঘুম চোখে অন্ধের মতো এগিয়ে যাই বেডের দিকে। ক্র্যাশ ট্রলিতে ঝুলতে থাকা টর্চ টা হাতে নিই আগে। অল্প অল্প চেয়ে দেখি সামনে তখন পেশেন্টের বাড়ির লোক পিলপিল করছে। সবার মুখে উদ্বিগ্নতা, কেউ কেউ কান্নাকাটিও করছে। আমাদের অবশ্য এসব দেখা রোজকার ঘটনা, তাই খুব একটা ফিলিংস আর আসে না।
এরপর পেশেন্টকে বেডে শোয়ানো হলে সোজা গিয়ে চোখে টর্চ মারি। দেখি পিউপিলারি রিফ্লেক্স কিছুই নেই। এরপর গলায় হাত দিয়ে ক্যারোটিড পালস দেখি। তাতেও কিছু নেই। অতঃপর টেকনিশিয়ানকে বলি ঝটপট ইসিজি করো, কারণ ততক্ষণে এটুকু বোঝা গেছে যে পেশেন্ট আর নেই। তবুও ইসিজিতে একটা ফ্ল্যাট লাইন এলে কনফার্ম হওয়া যায়।
যাইহোক, টেকনিশিয়ানের আর সিস্টারদের হাতে পেশেন্টটাকে কয়েক সেকেন্ড ছেড়ে আমি বেসিনে যাই চোখেমুখে জল দিতে। এমার্জেন্সী তখন ভরে গেছে পেশেন্টের বাড়ির লোকে। আমি ওনাদের বলি একজন থাকুন এবং বাকিরা প্লিজ বাইরে যান, কারণ এখানে ভীড় করলে কাজ করতে সমস্যা হতে পারে। আমার বলাতে তারা সবাই বাইরে গেলেন। কিন্তু তখনও পেশেন্টের স্ত্রী ছাড়াও আরো একজন ভদ্রলোক সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি চোখ রগড়ে শুধু সেই ভদ্রলোককে একবার দেখে নিলাম। বুঝলাম পেশেন্টের ভাই বা দাদা হবেন হয়তো,
চেহারার অনেকটা মিল রয়েছে তাদের।
আমি এরপর চোখেমুখে জল দিয়ে চশমাটা যেই না পরেছি, ওমনি টেকনিশিয়ান বলে ওঠে, " স্যার, মনে হচ্ছে আছে....."
কথাটা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পেশেন্টের ওপর CPR চলছে। ব্রাদার মনোজ দুহাত দিয়ে পেশেন্টের বুকের ওপর চাপাচাপি করছেন। আমিও আর দেরী না করে ছুটে গিয়ে ওদের সাথে হাত মেলাই। এরপর চলে ACLS প্রোটোকল। ACLS এর প্রত্যেকটা পদক্ষেপ নেবার সময় আমি লক্ষ্য করি পেশেন্টের পালস ফিরছে। শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে গলায় পাইপ ঢোকানোর আগেই দেখি পেশেন্ট নিজেই শ্বাসকার্য শুরু করে দিয়েছে। সবই মা Ambu র দয়া।
যাইহোক তারপর IV তে কিছু মেডিসিন দেবার পর কার্ডিওলজিস্টকে contact করি এবং তার কথামতো পেশেন্টকে সোজা ICU পাঠাই।
কিন্তু এই ঘটনার পর এমন এক সত্যি আমি জানতে পারি যা আমার সেদিনের ঘটনাকে সারাজীবন স্মরণে রাখবে।
পেশেন্টের বাড়ির লোক আমায় জানায়, ভদ্রলোকের কোনো দাদা বা ভাই ছিলো না। আর ইসিজি করার সময় বাড়ির লোকের মধ্যে ওনার স্ত্রী ব্যতীত অন্য কেউ সেখানে উপস্থিতও ছিলো না।
Comments
Post a Comment