একজন লোকোমাস্টারের নির্ঘুম রাতের অজানা কাহিনী........
পিন পতন শব্দ! রাত্রি দ্বি-প্রহর! দু একটা পাখি কিচিরমিচির ডাকছে। দূরের রাস্তার মাঝ প্লাটফর্ম ধরে হাটছি। হকারের ডাক.. এইইই পানি... এইইই ঝালমুড়ি... এইইই গরম ডিম, চানাচুর...। আওয়াজটা না ক্রমশঃ দূর থেকে কাছে ভেসে আসছে।।
আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন। ৩ নং প্লটফর্মে চট্টগ্রাম মেইল দাঁড়িয়ে আছে। আজ ঐ ট্রেনের দায়িত্বে থাকবো। সকল ট্রেনকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার অর্পিত দায়িত্ব নিয়েছিলাম ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে। এই দায়িত্ব কিন্তু স্বজ্ঞানে বুঝে শুনেই নিয়েছিলাম।
কেন জানেন?
- কিছু সুযোগ সুবিধা সহ হ্যান্ডসাম স্যালারী আছে বলে। শীতকালে যেমন গাছের পাতা ঝড়ে গিয়ে রুগ্ন হয়ে যায়, আমিও বয়সের বাড়ে যখন নুয়ে পড়ব তখন অন্যদের তুলনায় সামান্য বাড়তি সুবিধা পাবো এই চাকরিতে । এই সূবিধা কিন্তু ব্রীটিশ সরকার রেলওয়ের অত্যাবশীয় কর্মীদের জন্য রেখে গেছেন। ব্রীটিশরা শুধু শোষণ করতেই জানতেন না, ১৫৯ বছর পর জানলাম তারা দিতেও জানতেন।
ছোটকালে স্বপ্ন দেখতাম পাইলট হবো( হয়েছিও তাই উড়াল পথে নয়)। সাবসিডিয়ারী কিছু স্বপ্নও দেখতাম যেমন- ডিফ্যান্সে সেনা কর্মকর্তা হবো, কিংবা পুলিশ অফিসার। টিচার হওয়ার স্বপ্নও কিন্তু দেখেছি। স্বপ্নের জাল বহুমূখী হওয়ায় স্বপ্ন গুলো জালের ফাঁস দিয়ে বাহির হয়ে গেছে। যেমনটি জালের ফাঁস ছোট হওয়ায় জাটকা মাছ ধরা খেলো বড় ইলিশ ফসকে গেলো।
একটা নির্ঘুম রাত। ঝিকঝিক শব্দে ট্রেন ছুটে চলছে। কুয়াশার চাদরে সাদা আবৃত চারদিক। দৃষ্টি লাইন থেকে ফেরানো দায়। কখন সিগন্যাল বাতি চলে আসে। এই সিগন্যাল বাতি কিন্তু ওভারস্যুট করা যাবে না, সোজা গিয়ে পড়বে ধানক্ষেতে। জানালা দিয়ে মাথা বাহির করে ঠকঠক ঠান্ডায় এক পলকে তাকিয়ে থাকতে হয়। সিগন্যাল দেখা শেষ। মাথা ভিতরে আনা হলো। একি! মাথার চুল ভেজা কেন?
--বুঝছি ; কুয়াশাও না ছলনা করে। আবার, মায়া করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তাইতো চুলগুলো ভিজে যায়। চারদিকের হীম শীতল হাওয়া শ্বাস উর্ধ্বগতিতে প্রবাহিত হয়।
এই নিঝুম রাতে যাত্রীরা গভীর নিদ্রায় মগ্ন?
- হ্যাঁ/ না।
সারাদিনের কর্মব্যস্থতার পর ট্রেন যাত্রা। সূর্যোদয়ের পর গন্তব্যে কর্মপ্রাণে ফিরে আসা তাইতো একটু আধটু তন্দ্রাচ্ছন্ন। প্রেয়সী তার প্রিয়ার গাঁয়ে গাঁ হেলিয়ে পূর্নিমা দেখছে কিংবা কুয়াশার চাদর দেখছে। স্বপ্ন বুনছে আগামী ভবিষ্যতের।
ট্রেনে কর্মরত অন্যারা নির্ঘুম রাতে কী করছে?
-প্রশ্নটা আমার। উত্তরটা আপনার কাছে।
একটি ঘটনা বলি......
২০১৯ সাল ৫ ডিসেম্বর। ঢাকা থেকে ২১ঃ০০ ঘটিকায় ছেড়ে আসা মহানগর এক্সপ্রেসে দায়িত্বরত আমি লোকোমাষ্টার। ট্রেনটি যখন ফেণী স্টেশনের কাছাকাছি তখন রাত আনুমানিক তিনটা। মোবাইলে হঠাৎ মামার নম্বর বেজে উঠায় ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠলো। এত রাতে মামার ফোন? বাড়িতে আমার মা- বাবা থাকেন। শ্বশুর- শ্বাশুড়ি এবং আমার নানীও জীবিত আছেন। সাত পাঁচ চিন্তা করছি, মোবাইলের সাউন্ড কর্কশ হয়ে উঠছে। মোবাইল ধরতে ভয় পাচ্ছি। রিং টোন কেটে যাচ্ছে। ট্রেন ক্রমশ ফেণী স্টেশনে ঢুকে যাচ্ছে। যাত্রীর নিরাপত্তার স্বার্থে ফেণী স্টেশনে ট্রেন থামিয়ে মোবাইল রিসিভ করলাম।
-হেলো, হেলো... হেলো রানা। ফোন ধরছিস না কেনো? তুই কই?
- এই তো! মামা। আমি ট্রেনে আছি। চট্টগ্রাম যাচ্ছি।
- খবর শুনছিস?
- না মামা। কি হইছে?
- কিছুক্ষণ আগে তোর শ্বশুর মারা গেছে। স্টোক করেছিলো।হাসপাতালে নেওয়ার সময় পায় নাই। বড় ভালো মানুষ ছিলরে.....
কথাগুলো আমার কানে বেজে চলছে। আমি ভুল শুনলাম নাতো। আমার শ্বশুর আমাকে ছোট জামাই হিসাবে খুব ভালোবাসতো, স্নেহ করতো, মায়ার টান ছিলো। স্মৃতি খুঁজতে লাগলাম। চোখের কোনা ভিজে গেলো.......।
সহকর্মীর ডাক, "ভাই লাইন ক্লীয়ার পাইছি, সিগন্যাল হইছে, যান।"
ট্রেন চলছে। মিনিট দশের পর বাসা থেকে ফোন।
- হ্যালো বাবা( বড় মেয়ে)।
-মা। বলো।
- নানা ভাই মারা গেছে। মা কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেছে। আমি এখন কি করবো?
- তুমি মায়ের পাশে থাকো, আমি আসতেছি।
বুক ভরা কষ্ট। প্রিয়তমা স্ত্রী অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা। মেয়েদের নিয়ে দূঃচিন্তা। এতোকিছু মাথায় নিয়ে ট্রেনটিকে চট্টগ্রাম পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফিরি। তারপর শ্বশুরকে শেষ দেখা দেখার জন্য টাংগাইলের উদ্দেশ্যে রওনা হই।
হয়ত আরেকদিন, আরেকটি ফোন আসবে কোন ট্রেনে দায়িত্ব পালনের সময়।
- হ্যালো রানা.........তিনি মারা গেছেন। খুব ভালো লোক ছিলেন। আমি কাঁদবো না। আমি কাঁদতে ভুলে যাই। যাত্রীর নিরাপত্তা আগে।
নির্ঘুম রাতে ফোন বাজলে এখনো আঁৎকে উঠি।।
রাতে ট্রেনে কাজ করা সময় আমার স্ত্রী দু তিনবার ফোন করবে। আমি ঠিক আছি কি-না? ঘুম আসে কি-না? ভালো লাগে তার ফোন পাওয়াটা। আমার ক্লান্তি দূর হয় তার একটা ফোন পেলে। আমার সাথে সেও তো ডিউটি করছে। সে বলে' " তুমি ঠিক থাকলে যাত্রীরা নিরাপদে থাকবে। নিরাপদে থাকবে রেল তথা সরকারি সম্পদ। রেলের কর্মকর্তারা আরাম আয়াশে ঘুমাতে পারবে। তাদের কোন টেনশনে থাকতে হবে না।"
মাঝেমধ্যে ভাবি, এই বোকা মেয়েটার মাথায় এত বুদ্ধি আসে কোত্থেকে। রাগও করি। আমার সাথে রাত জেগে ডিউটি করতে হবে না। তুমি ঘুমাও।"
একজন সাধারণ ঘরের মেয়ে হয়ে তার চিন্তা চেতনা আমার ভালো লাগে। আমি তাকে সময় দিতে পারি না বলে তার কোন অভিযোগ নাই। আমার পেশা নিয়ে সে গর্ভবোধ করে। আমি জনগণ তথা রেলের সেবক। এটাই নাকি তার অহংকার।
আমার মেয়ে যখন ছোট ছিলো। দু-তিন দিন পরপর দেখা হতো। দশটা এগারোটার সময় ট্রেন ডিউটি করে যখন বাসায় ফিরতাম মেয়ে তখন ঘুম। আবার সকাল সকাল আরেক ট্রেনে ডিউটির জন্য বাহির হয়ে যেতাম। মেয়ের জন্য মন কাঁদতো। ঘুমন্ত মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে চলে যেতাম। করার কিছু ছিলো না।
আমার চাকরিতে বন্ধের দিন নাই, বিজয় দিবস নাই, স্বাধীনতা দিবস নাই, ইদ নাই, পূজা নাই, ভ্যালেন্টাইন ডে নাই, প্রিয়তমা স্ত্রী কিংবা প্রেয়সী কিংবা সন্তানদের নিয়ে কফি সপে যাওয়ার সুযোগ নাই। বন্ধু -বান্ধব নাই, তারা আমাকে ভুলে গেছে ; আমিও ভুলে যাই।
নাই আচার, অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, সামাজিক কিংবা ধর্মীও উৎসব। শুধু নাই আর নাই। আমি কী মানুষ? এই ভাবনা আমার মধ্যে নাই। প্রতিটি ইদের আগের রাতে সন্তানরা বাবার সাথে আনন্দ করতে চায়। ইদের দিন বাবার সাথে ঘুরতে যেতে চায়। আমিও ছোটকালে বাবার সাথে আনন্দ করেছি, ইদের মাঠে বাবার সাথে নামাজ পড়েছি। অন্যান্য চাকরিজীবিরাও করেন। আমার সন্তান... তোর এই বাবাকে ক্ষমা করে দিস।
পূর্বের কথায় আসি। এতো, এতো নাই, নাই এর মধ্যে ১৫৯ বছর আগে ব্রীটিশ সরকার লোকোমাষ্টারদের পরিবার পরিজন নিয়ে সচ্ছল ভাবে থাকার জন্য পার্ট অব পে হিসাবে মাইলেজ প্রথা চালু করেন। যা এখন পর্যন্ত বলবত আছে। ব্রীটিশ সরকার ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছে। ভারতের রেল উন্নতির শিকরে। ও দেশে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের বড় হয়ে কি হতে চাও? জিজ্ঞেস করলে কেউ কেউ বলে, " আমি বড় হয়ে লোকো পাইলট হতে চাই। " হতে চাইবে না কেন? ভারতের একজন লোকো পাইলট বিভিন্ন এলাউন্স সহ মাস শেষে দেড় লাখ রুপি বেতন পায়। আমরা কত পাই?
নির্ঘুম রাতের পর ট্রেনের যাত্রা শেষ হয়। সবাই ভুলে যায়। অনুসূচনা নাই। বাসায় ফিরি। মেয়েরা বড় হয়েছে। কলিং বেলের শব্দে দরজা খোলা নিয়ে প্রতিযোগিতা করে। ওরা আমার বুকে ঝাপটে পড়ে। পর্দার আড়ালে সে মৃদু হাসে.......।
লোকোমাস্টার গ্রেড ১
আব্দুল আওয়াল রানা
পাহাড়তলী লোকোসেড,চট্রগ্রাম।
©️ Subhajit ideas.com - ট্রেন চালক
Comments
Post a Comment